বিভিন্ন নামাজের আলোচনা করা হলো
ঈদের সালাত আমরা সেভাবেই আদায় করি যেভাবে আমরা সাধারন দুই রাকাত সালাত আদায় করি একমাত্র তাকবীর এর কথা বাদ দিয়ে। ঈদের সালাতের বিস্তারিত সংক্ষিপ্তবর্ণনা নিচে দেয়া হলঃ
ইমাম আযান বা ইকামাত ছাড়াই তাকবির আল-তাহরিমাহ দিয়ে সালাত শুরু
করবেন। আপনি হাত কাধঁ বা কানের লতি বরাবর তুলবেন এবং হাত বাধবেন। তারপর ছানা পড়বেন।
এরপর ইমাম ৩ বার তাকবির (আল্লাহু আকবার) বলবে্ন। ইমামের তাকবিরের সাথে সাথে আপনি প্রত্যেকবার-ই
তুলবেন (সাথে সাথে নিচু গলায় তাকবির (আল্লাহু আকবার)বলবেন) এবং হাত না বেধেঁ ছেড়ে দেবেন।
তবে ইমাম তৃতীয়বার তাকবির বলার পর আপনি হাত বাধঁবেন (যেভাবে আপনি সাধারনত ৫ ওয়াক্ত
সালাতে বাধেন)।
এই তিন তাকবিরের পর ইমাম কুরআন তিলাওয়াত করবেন যা আপনি অতি মনোযোগ
সহকারে শুনবেন। এরপর সাধারন সালাতের মতই সালাতের প্রথম রাকাত শেষ হবে।
সিজদা থেকে দ্বিতীয় রাকাতের জন্য ওটার পর ইমাম কুরান তিলাওয়াত দিয়ে
শুরু করবেন (সূরা ফাতিহা এবং অন্য সূরা) আপনি শান্তভাবে ও মনোযোগ সহকারে তা শুনবেন।
যখন ইমাম তিলাওয়াত শেষ করবেন তখন তিনি ৩ বার তাকবির বলবেন (এবার এই ৩ তাকবির রূকুতে
যাওয়ার আগে বলবেন)। প্রত্যেক তাকবিরে আপনি আগের মতই হাত তুলবেন এবং "আল্লাহু আকবার"
বলার পর হাত ছেড়ে দেবেন। এই ৩ তাকবির বলার পর ইমাম আরেকবার তাকবির (আল্লাহু আকবার)
বলবেন রূকুতে যাওয়ার জন্য। এই (৪র্থ) তাকবিরে আপনি হাত তুলবেন না। এবং "আল্লাহু
আকবার" বলে রূকুতে চলে যাবেন। সালাতের বাকী অংশ সাধারন ৫ ওয়াক্ত সালাতের মতই শেষ
করবেন।
জানাযার নামাযের নিয়ম:
মৃত ব্যাক্তিকে সামনে রেখে তার মাগফিরাত কামনার জন্য সকলে একত্রিত
হয়ে যে দু’আ পড়া হয়, ইহাকে জানাযার নামাজ বলে । আদবের সহিত বিনয়ের সাথে দাঁড়াবে। তারপর
নিয়ত করবে, (যেমন, আমি আল্লাহর উদ্দেশ্যে জানাযার ফরযে কেফায়ার নামাজ চার তাকবীর সহিত
কেবলামুখী হয়ে এই ইমামের পিছনে আদায় করছি।
এই ভাবে নিয়তের পর ১ম তাকবীর বলবে, তারপর ছানা অথবা সূরা ফাতিহা
পড়বে :
سُبْحَانَكَ اَللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالَى
جَدُّكَ وَجَلَّ ثَنَاءُكَ وَلاَ اِلَهَ غَيْرُكَ
উচ্চারণ : সুবহা-নাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, ওয়া তাবারা কাসমুকা
ওয়া তাআলা জাদ্দুকা, ওয়া জাল্লা ছানাউকা ওয়া লা-ইলাহা গাইরুক।
অনুবাদ : হে আল্লাহ আমরা তোমার পবিত্রতার গুণগান করিতেছি। তোমার
নাম মঙ্গলময় এবং তোমার সম্মান ও মর্যাদা অতি শ্রেষ্ঠ, তোমার জন্য প্রশংসা, তুমি ব্যতীত
আর কেহই উপাস্য নাই।
ছানার পর ২য় তাকবীর বলবে, তারপর দরুদে ইব্রাহীম পড়বে।
اَللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى اَلِ مُحَمَّدٍ كَمَا
صَلَّيْتَ عَلَى اِبْرَاهِيْمَ وَعَلَى اَلِ اِبْرَ اهِيْمَ اِنَّكَ حَمِيْدٌ مَّجِيْدٌ
– اَللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى اَلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى
اِبْرَا هِيْمَ وَعَلَى اَلِ اِبْرَا هِيْمَ اِنَّكَ حَمِيْدٌمَّجِيْدٌ
উচ্চারন : আল্লাহুম্মা সাল্লিআলা মুহাম্মাদিও ওয়া আলা আ-লি মুহাম্মাদ,
কামা- সাল্লাইতা আলা- ইব্রাহীমা ওয়া আলা- আ-লি ইব্রাহীম, ইন্নাকা হামী-দুম্মাজী-দ।
আল্লাহুম্মা বা-রিক আলা মুহাম্মাদিও ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা বা-রাকতা আলা- ইব্রাহীমা
ওয়া আলা- আ-লি ইব্রাহীম, ইন্নাকা হামী-দুম্মাজী-দ।
অনুবাদ : যে আল্লাহ! মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
এবং তাঁহার বংশধরগণের উপর ঐরূপ রহমত অবতীর্ণ কর যেইরূপ রহমত হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এবং
তাঁহার বংশধরগণের উপর অবতীর্ণ করিয়াছ। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসা ভাজন এবং মহামহিম। হে আল্লাহ!
মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং তাঁহার বংশধরগণের উপর সেইরূপ অনুগ্রহ
কর যে রূপ অনুগ্রহ ইব্রাহীম (আঃ) এবং তাঁহার বংশরগণের উপর করিয়াছ। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসা
ভাজন এবং মহামহিম।
দরুদে ইব্রাহীমের পর ৩য় তাকবীর বলবে, তারপর মৃত ব্যক্তির জন্য দু’আ
পড়বে।
اَلَّهُمَّ اغْفِرْلحَِيِّنَا وَمَيِّتِنَا وَشَاهِدِنَا وَغَائِبِنَا
وَصَغِيْرِنَا وَكَبِيْرِنَا وَذَكَرِنَا وَاُنْثَانَا اَللَّهُمَّ مَنْ اَحْيَيْتَهُ
مِنَّا فَاَحْيِهِ عَلَى الاِْسْلاَمِ وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى
الاِْيمَانِ بِرَحْمَتِكَ يَا َارْحَمَ الرَّحِمِيْنَ
উচ্চারণ : আল্লাহুম্মাগফিরলি হাইয়্যিনা ওয়া মাইয়্যিতিনা ওয়া শাহিদিনা
ওয়া গায়িবিনা ও ছাগীরিনা ও কাবীরিনা ওয়া যাকারিনা ওয়া উনছানা। আল্লাহুম্মা মান আহইয়াইতাহু
মিন্না ফাআহয়িহি আলাল ইসলাম, ওয়া মান তাওয়াফ্ ফাইতাহু মিন্না ফাতাওয়াফ ফাহু আলাল ঈমান,
বিরাহমাতিকা ইয়া আর হামার রাহিমীন।
অনুবাদ : হে আল্লাহ্ আমাদের জীবিত ও মৃত উপস্থিত ও অনুপস্থিত বালক
ও বৃদ্ধ পুরুষ ও স্ত্রীলোকদিগকে ক্ষমা কর। হে আল্লাহ আমাদের মধ্যে যাহাদিগকে তুমি জীবিত
রাখ তাহাদিগকে ইসলামের হালতে জীবিত রাখিও। আর যাহাদিগকে মৃত্যু মুখে পতিত কর। তাহাদিগকে
ঈমানের সাথে মৃত্যু বরণ করাইও।
মাইয়্যিত যদি নাবালক ছেলে হয় তবে নিচের দু’আ পড়বে।
اَللَّهُمَّ اجْعَلْهُ لَنَا فَرْطًا وْاَجْعَلْهُ لَنَا اَجْرًا
وَذُخْرًا وَاجْعَلْهُ لَنَا شَا فِعًا وَمُشَفَّعًا
উচ্চারণ : আল্লাহুম্মাজ্ আল হুলানা ফারতাঁও ওয়াজ্ আল হুলানা আজরাও
ওয়া যুখরা, ওয়াজ্ আল হুলানা শাফিয়াও ওয়া মুশাফ্ফায়া।
অনুবাদ : হে আল্লাহ! উহাকে আমাদের জন্য অগ্রগামী কর ও উহাকে আমাদের
পুরস্কার ও সাহায্যের উপলক্ষ কর এবং উহাকে আমাদের সুপারিশকারী ও গ্রহনীয় সুপারিশকারী
বানাও।
মাইয়্যিত যদি নাবালেগা মেয়ে হয় তবে নিচের দু’আ পড়বে।
اَللَّهُمَّ اجْعَلْهَا لَنَا فَرْطًا وَاجْعَلْهَا لَنَا اَجْرًا
وَذُخْرًا وَاجْعَلْهَا لَنَا شَا فِعًة وَمُشَفَّعةَ
উচ্চারণ : আল্লাহুম্মাজ্ আল হা-লানা ফারতাঁও ওয়াজ্ আল হা-লানা আজরাঁও
ওয়া যুখরা, ওয়াজ্ আল হা-লানা শাফিআতাউ ওয়া মুশাফ্ফায়াহ্।
অনুবাদ : হে আল্লাহ! ইহাকে আমাদের জন্য অগ্রগামী কর ও ইহাকে আমাদের
পুরস্কার ও সাহায্যের উপলক্ষ কর। এবং ইহাকে আমাদের সুপারিশকারী ও গ্রহনীয় সুপারিশকারী
বানাও।
মৃত ব্যক্তির জন্য দু’আর পর ৪র্থ তাকবীর বলবে, তারপর সালাম ফিরিয়ে
নামাজ শেষ করবে।
বুরাইদা (রা) বলেন,
রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন, “মানুষের শরীরে ৩৬০ টি জোড় রয়েছে।
অতএব মানুষের কর্তব্য হল প্রত্যেক জোড়ের জন্য একটি করে সদাকা করা।” সাহাবায়ে কেরাম
(রা) বললেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ্! কার শক্তি আছে এই কাজ করার?” তিনি (সা) বললেন, “মসজিদে
কোথাও কারোর থুতু দেখলে তা ঢেকে দাও অথবা রাস্তায় কোন ক্ষতিকারক কিছু দেখলে সরিয়ে
দাও। তবে এমন কিছু না পেলে, চাশতের দুই রাকা’আত সালাতই এর জন্য যথেষ্ট।” [আবু দাউদ;
কিতাবুল ‘আদাব’, অধ্যায়ঃ ৪১, হাদীস নং:৫২২২]
উপরিউক্ত হাদীসটি মুলত চাশতের সালাত বা সালাতুদ্ দুহা’র অপরিসীম
গুরুত্ব ও মাহাত্ম্যের কথাই তুলে ধরে। এর থেকে আরো বোঝা যায় যে,চাশতের সালাত তথা সালাতুদ্
দুহা ৩৬০ টি সাদাকার সমতুল্য।
আবু হোরাইরা (রা) বলেন,
“আমার বন্ধু [মুহাম্মাদ (সা)] আমাকে তিনটি বিষয় আমল করার উপদেশ
দিয়েছেনঃ প্রতি মাসের প্রথম তিন দিন রোজা রাখা; চাশতের সালাত (সালাতুদ্ দুহা) আদায়
করা এবং ঘুমাতে যাওয়ার পূর্বে বিতরের সালাত আদায় করা।" [সহীহ্ আল বুখারী;
“তাহাজ্জুদ” অনুচ্ছেদ, অধ্যায়ঃ ২, হাদীস নং:২৭৪ এবং সহীহ্ মুসলিম; কিতাবুস্ সালাত,
অধ্যায়ঃ ৪, হাদীস নং:১৫৬০]
চাশতরে সালাত
আবু সাঈদ (রা) হতে বর্ণিত,
“রাসূল (সা) ততক্ষন পর্যন্ত চাশতের সালাত পড়তে থাকতেন, যতক্ষনে
আমরা ভাবতে শুরু করাতাম যে তিনি (সা) এই সালাত আর কখনো বাদ দেবেন না। আবার যখন এই সালাত
আদায় করা বন্ধ রাখতেন, আমরা ভাবতাম হয়ত তিনি এই সালাত আর কখনই আদায় করবেন না।"
(তিরমিযি)
চাশতের সালাতের রাকা’আতের সংখ্যা ২, ৪, ৮, ১২ পর্যন্ত পাওয়া যায়।
মক্কা বিজয়ের দিন দুপুরের পূর্বে আল্লাহ্র রাসূল (সা) আলী (রা) এর বোন উম্মে হানী
(রা) এর গৃহে খুবই সংক্ষিপ্তভাবে ৮ রাকা’আত পড়েছিলেন। সংক্ষিপ্তভাবে পড়লেও রুকু’
এবং সিজদায় তিনি পূর্ণ ধীরস্থিরতা বজায় রেখেছিলেন এবং প্রতি দুই রাকা’আত অন্তর সালাম
ফিরিয়ে ছিলেন।[সহীহ্ আল বুখারী; “সালাত সংক্ষিপ্তকরন” অনুচ্ছেদ, অধ্যায়ঃ ২, হাদীস
নং:২০৭]
ইশরাক্ক ও চাশ্তের সালাত আদায়ের উপযুক্ত সময়ঃ
“ইশরাক্ক” এর সালাতই হল “চাশতের সালাত” বা “সালাতুদ্ দুহা”। “দুহা”
শব্দের অর্থ প্রভাত সূর্যের ঔজ্জল্য, যা সূর্য স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে
শুরু হয়। এই সালাত প্রথম প্রহরের পর থেকে দ্বিপ্রহরের পূর্বেই পড়া হয় বলে একে “সালাতুদ
দুহা” বা “চাশতের সালাত” বলা হয়। তবে প্রথম প্রহরের শুরুতে পড়লে তাকে “সালাতুল ইশরাক্ক”
বলে। এই সালাত বাড়ীতে পড়া মুস্তাহাব। এটি সর্বদা পড়া এবং আবশ্যিক গণ্য করা ঠিক নয়।
কেননা, রাসূল (সা) এই সালাত কখনো পড়তেন, আবার কখনো ছেড়ে দিতেন। উল্লেখ্য যে, এই সালাত
“সালাতুল আউয়াবীন” নামেও পরিচিত।
শেইখ ইবন বাজ্ (র) বলেছেন,
“ইশরাক্ক সালাত শুরু থেকেই চাশতের সালাত হিসেব আদায় হয়ে আসছে।”
[ মাজমূ’ ফাতাওয়াহ্ আল শেইখ ইবন বাজ্, ১১/৪০১ ]
চাশতের সালাতের সময় হচ্ছে, সূর্য একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় উঠার পর থেকে শুরু করে যোহর সালাতের ঠিক পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত।শেইখ ইবন ঊসাইমীন (র) এর মতে,
" চাশতের সালাত আদায়ের সময় হল সূর্য উঠার ১৫ মিনিট পর থেকে
শুরু করে যোহর সালাতের ১০ মিনিট পূর্ব পর্যন্ত।" [ আল-শারহ্ আল-মুম্তি, ৪/১২২
]
অতএব, এই পুরো সময়টাই হচ্ছে চাশতের সালাত বা সালাতুদ্ দুহা এর
সময়।সূর্যের তাপ যখন প্রখর হতে শুরু করে তখন এই সালাত আদায় করা উত্তম। কেননা,নবী
কারীম (সা) বলেছেন,“এই সালাত (চাশতের সালাত) আদায়ের উত্তম সময় হচ্ছে তখন, যখন সূর্যের
তাপ এতোটা প্রখর যে, সদ্য প্রাপ্তবয়স্ক উটও সেই তাপ অনুভব করতে পারে।” [সহীহ্ মুসলিম;
কিতাবুস্ সালাত, অধ্যায়ঃ ৪, হাদীস নং:১৬৩০]শেইখ ইবন বাজ্ঃ মাজমূ’ ফাতাওয়াহ্, ১১/৩৯৫
বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন দিনের এক চতুর্থাংশ অর্থাৎ, দিনের চার ভাগের
একভাগ পার হয় তখন এই সালাত আদায় করা উত্তম। কাজেই, চাশতের সালাত বা সালাতুদ্ দুহা
আদায় করার উত্তম সময়টি হচ্ছে সূর্যোদয় এবং যোহর সালাতের মধ্যবর্তী সময়টা।
তাহাজুদ নামাজের হাদীস:
সুন্নত নামাজগুলোর মধ্যে তাহাজ্জুদ অন্যতম। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ
ফরজ হওয়ার আগে মুসলমানরা আবশ্যক হিসেবে এ নামাজ আদায় করতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর
ওপর তাহাজ্জুদ ফরজ ছিল। সাহাবায়ে কেরামও এ নামাজ গুরুত্বের সঙ্গে আদায় করতেন। এ নামাজে
শারীরিক, মানসিক ও আত্মিক প্রবৃদ্ধি ও প্রশান্তি লাভ হয়। গভীর রাতে ঘুম থেকে উঠে এ
নামাজ আদায় করা হয় বিধায় একে তাহাজ্জুদ বলে অভিহিত করা হয়। তাহাজ্জুদ নফল পর্যায়ের
সুন্নত। যা আমল করতে না পারলে কোনো গোনাহ নেই।
এ নামাজের ফজিলত ও গুরুত্ব অনেক বেশি। পবিত্র কোরআনে তাহাজ্জুদ
নামাজের জন্য বিশেষভাবে তাগিদ করা হয়েছে। উম্মতকে যেহেতু রাসুলের আনুগত্য করার নির্দেশ
দেয়া হয়েছে, সেহেতু তাহাজ্জুদের এ তাগিদ পরোক্ষভাবে সমগ্র উম্মতের জন্য করা হয়েছে।
এ মর্মে ইরশাদ হয়েছে—‘আর রাতের কিছু অংশে আপনি তাহাজ্জুদ আদায় করতে থাকুন। এটা আপনার
জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে অতিরিক্ত পাওনা। আশা করা যায় আপনার প্রতিপালক আপনাকে মাকামে
মাহমুদ তথা প্রশংসিত স্থানে প্রতিষ্ঠিত করবেন।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ৭৯)
রমজানের চাহিদা তাকওয়া সৃষ্টির মাধ্যমে সুন্দর পৃথিবী উপহার দেয়া।
তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়ার পথ সবচেয়ে বেশি সুপ্রসন্ন হয়। এজন্য যারা
নিয়মিত তাহাজ্জুদের আমল করে, কোরআনে তাদের মুহসিন ও মুত্তাকি নামে অভিহিত করে তাদের
আল্লাহর রহমত ও পরকালে চিরন্তন সুখ-সম্পদের অধিকারী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আল্লাহ
তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তারা রাতের অল্প অংশেই ঘুমাত এবং শেষ রাতে ক্ষমা প্রার্থনা করত।’
মহানবী (সা.) তাহাজ্জুদ নামাজকে সবচেয়ে উত্কৃষ্ট নামাজ বলে ঘোষণা
করেছেন, যা মুসলিম শরিফের সুস্পষ্ট বর্ণনায় রয়েছে। তিনি মদিনায় আগমনের পর তাঁর প্রথম
ভাষণেই সফলতার চাবিকাঠি হিসেবে রাত জাগরণের কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘হে লোকসব!
ইসলামের প্রচার ও প্রসার কর, মানুষকে আহার দান কর, আত্মীয়তা অটুট রাখ, আর যখন মানুষ
রাতে ঘুমিয়ে থাকবে তখন তোমরা নামাজ আদায় করতে থাকবে। তবেই তোমরা সফল হবে, নিরাপদে
জান্নাতে যেতে পারবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তাহাজ্জুদ সালাতের ব্যবস্থা কর, এটা নেক লোকের
স্বভাব, এটা তোমাদের আল্লাহর নৈকট্য দান করবে, গোনাহ থেকে বাঁচিয়ে রাখবে, আর শরীর
থেকে রোগ দূর করবে।’ (মুসলিম)
তাহাজ্জুদ সালাত দুই রাকাত থেকে বার রাকাত পর্যন্ত পড়ার প্রচলন
রয়েছে। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘হজরত নবী করিম (সা.) রমজান এবং রমজানের বাইরে আট
রাকাতের বেশি কিয়াম করতেন না।’ হাদিসের ব্যাখ্যাকাররা এই বর্ণনার ব্যাখ্যায় কিয়াম
বলতে তাহাজ্জুদের নামাজকেই বুঝিয়েছেন। নবী করিম (সা.) এই আট রাকাত সব সময় শেষ রাতে
আদায় করতেন। এটি ‘কিয়ামুল লাইল’ নামে প্রচলিত রয়েছে এবং আল্লাহওয়ালাদের অনেকেই
রমজানে ‘কিয়ামুল লাইল’ জামাতের সঙ্গে আদায় করে থাকেন।
তাই তাহাজ্জুদ নামাজের জন্য শেষ রাতে ওঠার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
হঠাত্ করে গভীর রাতে ওঠার অভ্যাস গড়ে তোলা নিতান্তই কঠিন কাজ। তবে বছরের এগারো মাস
শেষ রাতে জেগে তাহাজ্জুদ পড়া কষ্টকর হলেও রমজানে এটি মোটেও কঠিন নয়। রমজান মাসে যেহেতু
শেষ রাতে সাহরি খাওয়ার জন্য জাগতে হয়, তখন তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করার একটি সুবর্ণ
সুযোগ চলে আসে। এ রমজানে অভ্যস্ত হয়ে সারা বছর তাহাজ্জুদের আমল জারি রাখা সম্ভব। এ
সুযোগ কাজে লাগানোর বিকল্প নেই।
জীবনে একবার হলেও সালাতুল তাসবিহ আদায় করবে:
হযরত ইবনে আব্বাস(রাঃ) বলেন, রাসুল(সাঃ) হযরত ইবনে আব্বাস(রাঃ)
কে বলেন, “হে আব্বাস, আমার চাচা আমি কি আপনাকে একটি দান বা বকশিশ দিব, আপনার সামনে
একটি তফফা পেশ করব, আমি কি আপনাকে এমন একটি আমল বলে দিব যা পালন করলে আপনি ১০ টি উপকার
লাভ করবেন অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা আপনার অতিত- ভবিষ্যতের, নতুন-পুরাতন, ভুলে বা জেনেশুনে,
ছোট – বড়, গোপনে বা প্রকাশে করা সকল গুনাহ এ মাফ করে দিবেন।সেই আমল হল আপনি ৪রাকাত
সালাতুল তাসবিহ আদায় করবেন। যদি আপনার দ্বারা সম্ভব হয় তবে প্রতিদিন একবার এই নামাজ
পরবেন, যদি প্রতিদিন পরতে না পারেন তবে প্রত্যেক জুমার দিন, আর সেটাও সম্ভব না হলে
বছরে একবার এই নামাজ পরবেন। আর সেটাও সম্ভব না হলে জীবনে একবার হলেও পরে নেবেন”।
সালাতুল তাসবিহ পড়ার নিয়ম – হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মোবারক(রাঃ) ও
অন্যান্য ওলামা হতে এই নামাজের ফজিলত নকল করা হয়েছে এবং তাদের নিকট হতে এই তরিকা বর্ণনা
করা হয়েছে- “ছানা পড়ার পর এই কালেমা গুলি ১৫ বার – সুবহানাল্লহি ওআল হামদুলিল্লাহি
ওআলা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবর পরবেন, অতঃপর আউজুবিল্লাহ, বিছমিল্লাহ, সুরা ফাতিহা
ও অন্য সুরা মিলানোর পর রুকুতে যাওয়ার পূর্বে ১০বার পরবেন, রুকুতে গিয়ে ১০বার পরবেন,
রুকু থেকে উঠে ১০বার, সিজদায় গিয়ে সিজদার তাসবিহ পড়ার পর ১০ বার,বসে ১০ বার এবং আবার
সিজদায় গিয়ে সিজদার তাসবিহ পড়ার পর ১০ বার পরবেন, এভাবে ৭৫ বার পড়া হয়ে গেল, তারপর
দাড়িয়ে সুরা ফাতিহা পড়ার পূর্বে ১৫ বার পরে পূর্বের নিয়মে পরে হবে। যদি কোন জায়গায়
সংখ্যা কম হয়ে যায় বা ভুলে যাওয়া হয় তবে পরবর্তী রুকুনে তা আদায় করতে হবে। আর ২ সিজদার
মাঝখানে বা রুকু থেকে উঠে দাঁড়ানোর পর দাড়িয়ে ভুলে যাওয়া তাসবিহ আদায় না করা। যদি নামাজে
সহু সিজদাহ দিতে হয় তবে সহু সিজদার মাঝে এই তাসবিহ গুলা পড়া লাগবেনা। তবে যদি কোন কিছুর
রাকাত ভুলে যাওয়া হয় তবে সেখানে আদায় করলে চলবে। এই তাসবিহ গুলা পড়ার সময় আঙ্গুলে গোনা
যাবেনা। তবে আঙ্গুল দিয়ে চাপ দিয়ে সংখ্যা কে মনে রাখা যেতে পারে।
কসর আরবি শব্দ আর এর অর্থ হলো কম করা, কমানো। ইসলামী শরিয়তে কোনো
ব্যক্তি যদি ৪৮ মাইল বা তারও বেশি দূরত্বের সফরে বাড়ি থেকে বের হয় তাহলে সে মুসাফির।
আর সে যদি সেখানে ১৫ দিনের কম সময় থাকার নিয়ত করে তবে সে চার রাকাতবিশিষ্ট ফরজ নামাজ
দুই রাকাত পড়বে।
যেমন- জোহর, আসর, এশা- এটাই হলো সংক্ষেপ করা বা কসর নামাজ। মহান
আল্লাহ তায়ালা এই সংক্ষেপ করার মধ্যেই অধিক কল্যাণ রেখেছেন। আল কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে-
‘তোমরা যখন জমিনে সফর করবে তখন তোমাদের জন্য নামাজের কসর করায় কোনো আপত্তি নেই।’ (সূরা
নিসা-১০)।
এ প্রসঙ্গে হজরত আনাস রা: বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ সা:-এর সাথে
মদিনা থেকে মক্কাভিমুখে রওনা হয়েছিলাম। তিনি ফরজ নামাজ দুই রাকাত আদায় করলেন, যতক্ষণ
পর্যন্ত না আমরা মদিনায় ফিরে এলাম। এ সময় হজরত আনাস রা:-কে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনারা
কি সেখানে কিছু দিন অবস্থান করেছিলেন? তিনি বললেন, আমরা ১০ দিন অবস্থান করেছিলাম।
(বুখারি)। মুসলিম মিল্লাতের জন্য নামাজের কসর মহান আল্লাহ তায়ালার নিয়ামত। স্রষ্টার
দয়া, অনুগ্রহ।
কেবল চার রাকাত বিশিষ্ট ফরজ নামাজ যেমন- জোহর, আসর ও এশার নামাজচার রাকাতের পরিবর্তে দুই রাকাত পড়বেন।
২. মুসাফির ইমামত করলে মুক্তাদিদের আগেই বলে দেবে যে, সে মুসাফির
এবং দুই রাকাত পড়ে সালাম ফিরাবে এবং মুকিম নামাজিরা দাঁড়িয়ে বাকি দুই রাকাত পড়ে নেবেন।
৩. মুসাফির ব্যক্তি যদি মুকিম ইমামের পেছনে নামাজ পড়েন তাহলে ইমামের
অনুসরণে তিনিও চার রাকাত পড়বেন।
৪. মুসাফির অবস্থায় যদি কোনো নামাজ কাজা হয়ে যায়, আর তা বাড়ি ফিরে
পড়েন তাহলে কসরই পড়বেন এবং বাড়ি থাকা অবস্থায় কোনো কাজা নামাজ যদি সফরে আদায় করেন তবে
তা পূর্ণ নামাজই পড়তে হবে।
৫. প্রত্যেক নামাজের নিয়ত করতে হবে, কোন ওয়াক্তের কসর পড়বেন।
৬. মুসাফির ব্যক্তির ব্যস্ততা থাকলে ফজরের সুন্নত ব্যতীত অন্যান্য
সুন্নত নামাজ ছেড়ে দেবেন। তবে ব্যস্ততা না থাকলে সুন্নত পড়া উত্তম।
৭. ১৫ দিন বা তার বেশি থাকার নিয়ত হয়নি এবং আগেই চলে যাবে চলে যাবে
করেও যাওয়া হচ্ছে না, এভাবে ১৫ দিন বা তার বেশি দিন থাকলেও কসর পড়বেন।
৮. দুই রাকাত, তিন রাকাত ফরজ এবং ওয়াজিব নামাজ যথাযথভাবে আদায় করতে
হবে।
৯. কেউ অসৎ উদ্দেশ্যে মুসাফির সাজলে শরিয়তের দৃষ্টিতে তিনি মুসাফির
হিসেবে পরিগণিত হবেন না এবং তার জন্য কসরের হুকুমও প্রযোজ্য হবে না।
কসর নামাজের ফজিলত : কসর নামাজের ফজিলত অপরিসীম। মহান আল্লাহ রাব্বুল
আলামিন তার প্রিয় বান্দাদের সার্বিক কল্যাণের প্রতি লক্ষ করেই সহজ বিধান দিয়েছেন। ইসলাম
এসেছে মানুষের কল্যাণের জন্য। মুক্তির জন্য। আর মুসাফির সফরে অনেক সমস্যায় থাকেন, যে
কারণে ইসলাম নামাজের মতো এত বড় ইবাদতেও ছাড় দিয়েছে।
মূলত এই কসর নামাজের বিধানের মধ্যে মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি বড়
শিক্ষা রয়েছে, তাহলো কোনো অবস্থায়ই ফরজ ইবাদত অলসতার কারণে বা সমস্যা থাকার কারণে পুরোপুরি
ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই।
কসরের নামাজের ফজিলতের কথা বলে রাসূল সা: ইরশাদ করেন, ‘তোমরা সফরে
নামাজকে কসর করো-এর মধ্যেই রয়েছে উত্তম প্রতিদান’ (বায়হাকি)।
ইমামে আজম আবু হানিফা রহ: বলেন, ‘সফরে চার রাকাত নামাজকে দুই রাকাতই
পড়তে হবে। কেননা আল্লাহ তায়ালা এ দুই রাকাতের বিনিময়ে চার রাকাতের প্রতিদান তো দেবেনই,
সেই সাথে মুসাফির অবস্থায় নামাজ পড়ার সওয়াব অনেক বেশি। তাই সফরে কসর না পড়ে পূর্ণ নামাজ
পড়া যাবে না।’
মানুষ আল্লাহ তায়ালার প্রিয় সৃষ্টি। আল্লাহ তায়ালার নির্দেশের প্রতি
অনুগত থাকাই তার একান্ত কর্তব্য। সেহেতু মানুষের তথা মুসলিম জাতির দায়িত্ব হলো যেখানে
যে অবস্থাতেই সে থাকুক না কেন, আল্লাহ তায়ালার এবাদতে ব্যাপৃত থাকতে হবে।
Comments
Post a Comment